মোশাররফ ক্ষমা চাইলেন কেন, প্রশ্ন তসলিমা নাসরিনের

142

মেয়েদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য করার পর জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম কেন ক্ষমা চেয়েছেন, এমন প্রশ্ন তুলেছেন তসলিমা নাসরিন। নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক পোস্টে এ প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাসিত এই লেখিকা।

স্ট্যাটাসে মেয়েদের পোশাক নিয়ে মোশাররফ করিমের দেওয়া বক্তব্য সমর্থন করেন তসলিমা।

এর আগে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ‘জাগো বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানাতে গিয়ে সম্প্রতি মোশাররফ করিম বলেন, ‘একটা মেয়ে তার পছন্দমতো পোশাক পরবে না? আচ্ছা পোশাক পরলেই যদি প্রবলেম হয়, তাহলে সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব, যে বোরকা পরেছিলেন তার ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব? কোনো যুক্তি আছে?’

মোশাররফ করিমের এ বক্তব্য ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে’ বলে অভিযোগ করেন অনেকে।

এ অবস্থায় দুঃখ প্রকাশ করে আরেকটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে মোশাররফ বলেন, ‘চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরে আমার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের একটি অংশে আমার কথায় অনেকে আহত হয়েছেন। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আমি যা বলতে চেয়েছি, তা হয়তো পরিষ্কার হয়নি। আমি পোশাকের শালীনতায় বিশ্বাসী এবং তার প্রয়োজন আছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা আমার অভিপ্রায় না। এ ভুল অনিচ্ছাকৃত। আমি দুঃখিত। দয়া করে সবাই ক্ষমা করবেন।’

মোশাররফ করিমের ক্ষমা চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন তসলিমা নাসরিন। পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো :

‘মোশাররফ করিম বাংলাদেশের টিভি নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা। তিনি সেদিন কিছু কথা বলেছেন স্টুডিওর দর্শকদের উদ্দেশে। মেয়েদের যৌন হেনস্থার জন্য পোশাক নাকি অন্য কিছু দায়ী! যা বললেন তা এমন কোনও বিপ্লবী কথা নয়। পোশাক যদি দায়ী, তাহলে ৭ বছর বয়সী মেয়ে কি কোনও যৌন উত্তেজক পোশাক পরে যে তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়? বোরখা পরা মহিলাই বা কী কারণে যৌন হেনস্থার শিকার হয়? মোশাররফ বললেন, মেয়েদের পোশাক নয়, পুরুষের নোংরা অন্তরই ধর্ষণের জন্য দায়ী। সুতরাং অন্তরের ময়লা দূর করতে হলে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, এই যুদ্ধের আরেক নামই জিহাদ। যদিও মোশাররফ জিহাদের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা নবী মোহাম্মদের ব্যাখ্যা নয়। নবী মোহাম্মদ দারুল ইসলাম বানানোর জন্য উম্মতদের হুকুম দিয়েছেন বিধর্মীদের মারার। মানুষকে কুপিয়ে মেরে ফেলা যখন সভ্য জগতে সমালোচিত হচ্ছে, তখনই ইসলামের পন্ডিতেরা বুদ্ধি করে বলেছেন, নিজের ভেতরের খারাপ মানুষটা বা খারাপ মানসিকতাটার বিরুদ্ধে সংগ্রামের আরেক নামই জিহাদ। মোশাররফ সেই ভালো মানুষী সংজ্ঞা দিয়েছেন জিহাদের। মোশাররফের মতো সাদামাটা কথাবার্তা যদি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত দিয়ে থাকে, আর সেই কারণে তাঁকে যদি ক্ষমা প্রার্থণা করতে হয়, তাহলে তো অন্ধকার যুগ চলছে দেশে। মোশাররফকে ক্ষমা চাইতে হলো তাদের কাছে, যারা মনে করে মেয়েদের স্বল্প পোশাকের কারণেই পুরুষেরা তাদের ধর্ষণ করে, যারা মনে করে বোরখা আর হিজাব পরে ধর্ষণ বন্ধ করতে পারে মেয়েরাই। পুরুষদেও মোশাররফ পরামর্শ দিয়েছিলেন ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য।

পুরুষানুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্তরা চান না পুরুষ ধর্ষণ বন্ধ করুক, তারা চান ধর্ষণ যেহেতু মেয়েদের সমস্যা, সুতরাং মেয়েদের বন্ধ করতে হবে ধর্ষণ, গা গতর ঢেকে, নিজেদের পছন্দসই পোশাক পরার স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে, নিজেদের মানবাধিকার বিসর্জন দিয়ে, নিজেদের অস্তিত্বকে অস্বীকার ক’রে।

মোশাররফ ক্ষমা চাইলেন কেন? তিনি তো ভালো জানেন যে মেয়েরা তাদের পোশাকের কারণে ধর্ষিতা হয় না। সত্য কথা বলার জন্য ক্ষমা চাইতে হয় না কখনও। ক্ষমা চাইলে নিজেকে বড় ক্ষুদ্র করে ফেলা হয়। নিজের ওই ক্ষুদ্র, ওই কুণ্ঠিত কুঞ্চিত রূপটি দেখতে কারোরই ভালো লাগে না।’